Thursday, September 6, 2018

আমরা মানবজাতি বটে!


ষোড়শ শতাব্দীর শুরুর দিকে 'রেনেসাঁ' শুরু হয়েছিল ইতালিতে, যা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ইউরোপে। এটি ছিল মূলত একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন। কিন্তু তা মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। এর ফলে সামন্ত  বা জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয় এবং সেই সাথে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মানুষ স্বাধীনতা পায় তাঁর ব্যক্তিগত, অর্থনৈতিক ধর্মীয়, সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। মানুষ অজানাকে প্রশ্ন করে, অসীমকে জানার জন্য বের হয়ে পড়ে এবং একজন একের অধিক বিষয়ে জ্ঞানার্জন করে। এই সময়ে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হল মানবতার ধারণা। ’মানুষ মানুষের জন্য’ এই ধারণা ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমরা কতটুকু মানবিক হতে পেরেছি? আমরা কি জাতি, ধর্ম ও বর্ণের প্রশ্নে একটুও ছাড় দিছি?

মানব সভ্যতায় সবসময় যারা সংখ্যায় কম (জাতি, ধর্ম বা বর্ণ) তারাই শাসিত, শোষিত বা তাড়িত। জাতি, ধর্ম বা বর্ণের বৈষম্যের স্বীকার হয়ে বর্তমানে পৃথিবীতে সাড়ে ছয় কোটিরও বেশি তাদের নিজ এলাকা থেকে বিতাড়িত হয়েছে। তারা সবাই মানবেতর জীবনযাপন করছে, বেশিরভাগ অন্যদেশে শরণার্থী হয়েছে। তারা সবাই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনী ষাট লক্ষ ইহুদি হত্যা করেছিল যা ইতিহাসে 'হলোকস্ট' নামে পরিচিত। এটা হিটলারের জাতি বিদ্বেষ ও সাম্রাজ্যবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ। তবুও আমরা এখনও হিটলারকে বাহবা দেই। কিন্তু মানুষ কে হত্যা কোন ধর্ম বর্ণ সমর্থন করে না। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে হাজার হাজার বেসামরিক লোক মারা যাচ্ছে, ঘরবাড়ি হারাচ্ছে। সিরিয়া থেকে দেশ ছেড়ে অর্ধেক জনগন পালিয়ে শরণার্থী হয়েছে। আফগানিস্থান ও ইরাক থেকে অনেক লোকজন শরণার্থী হয়েছে। গত শতাব্দীর শেষ থেকে আজ পর্যন্ত যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখের মত শরণার্থী হয়েছে তার প্রধান কারন শক্তিশালী দেশগুলো, যারা গনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের সিরাপ খাওয়ায়। এর প্রধান কারণ হচ্ছে তাদের সাম্রাজ্যবাদী চেতনা।

২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাতীগত নিধনের স্বীকার হয় রোয়াঁইঙ্গা মুসলিমরা। তারা রোয়াঁইঙ্গাদের বসতবাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে তাদের দেশ থেকে উচ্ছেদ করে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ১০ লক্ষ রোয়াঁইঙ্গা মুসলিম শরণার্থী হয়েছে। সম্প্রতি ভারত সরকার আসাম প্রদেশে প্রায় চল্লিশ লক্ষ  বাঙ্গালীকে সনাক্ত করেছে, যাদের বাংলাদেশী বলা হচ্ছে। হয়ত তাদেরকে নিজ দেশে শরনার্থী করে রাখা হবে।

জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই মানুষ। আমাদের সবার শরীরে একই রক্ত বইছে। মানুষ হিসেবে একটা দেশে সবার সমান অধিকার রয়েছে। কিন্তু উগ্রজাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার জন্যে সংখ্যালঘুদের ঘরছাড়া হতে হয়। আমরা মানবতার কথা বলি। মানুষ হিসেবে সবার বেঁচে থাকা এবং মৌলিক অধিকার রয়েছে।  কিন্তু আমরা মানুষ হয়ে মানুষকে হত্যা করি, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেই, দেশ থেকে তাড়িয়ে দেই। আমরা মানুষ হয়ে মানুষকে নির্মূল করতে চাই। আমরা মানবজাতি বটে!



৫ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দ
আশেক রায়হান
ইসল (ESOL), আইএমএল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।





তথ্যসূত্র: